
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো.আব্দুল খালেক মিয়াকে অপসারণের বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) একাধিক চিঠিতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান উঠে আসায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই বিষয় নিয়ে আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের তিনটি চিঠিতে তিন ধরনের বার্তা পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় জানা গেছে।
কোনো চিঠিতে সিইও অপসারণকে আইনবহির্ভূত ও অকার্যকর বলা হয়েছে,আবার পরবর্তী চিঠিতে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। অন্য একটি চিঠিতে তার বেতন-ভাতা কেন বন্ধ রাখা হয়েছে,সে বিষয়ে কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
এ নিয়ে বীমা খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—একই বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থানের এই পরিবর্তনের কারণ কী এবং সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা রয়েছে?
২০২৫ সালের চিঠিতে অপসারণকে অকার্যকর বলা হয়
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী,২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের উপপরিচালকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড বীমা আইন, ২০১০-এর ধারা ৮০-এর উপধারা ২ এবং বীমা কোম্পানি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা, ২০১২-এর প্রবিধি ৭ লঙ্ঘন করে সিইও মো. আব্দুল খালেক মিয়াকে অপসারণ করেছে।
চিঠিতে তার অপসারণকে অকার্যকর হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাকে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বহাল রয়েছেন বলে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়।
বেতন-ভাতা বন্ধের ব্যাখ্যা চায় আইডিআরএ
এরপর ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের আরেক চিঠিতে মো. আব্দুল খালেক মিয়ার বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার বিষয়ে কোম্পানির কাছে ব্যাখ্যা চায় আইডিআরএ।
ওই চিঠিতে তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়,তিনি ছুটিতে থাকা অবস্থায় তার চাকরির অবসানসংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। শোকজের জবাব দেওয়ার পরও তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং বেতন-ভাতা প্রদান না করে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এ অবস্থায় চুক্তির ভিত্তিতে তার প্রাপ্য বেতন-ভাতা কেন পরিশোধ করা হচ্ছে না,সে বিষয়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে কোম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এক বছর পর অপসারণের সিদ্ধান্ত
তবে প্রায় এক বছর পর ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আইডিআরএর আরেক চিঠিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়,আব্দুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কোম্পানি গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তদন্ত কমিটি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সুপারিশ করে।
পরবর্তীতে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের ২৫০তম সভায় তাকে চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিষয়টি আইডিআরএতে পাঠানো হয়।
বিষয়টি আইডিআরএর ১৯৯তম সভায় উপস্থাপন করা হলে বীমা কোম্পানি (মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ) প্রবিধানমালা, ২০১২-এর প্রবিধি ৭(৪) অনুযায়ী তাকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই বিষয়ে আইডিআরএর এসব ভিন্নমুখী চিঠি সামনে আসায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, আইডিআরএর নন-লাইফ বিভাগের সদস্য আবু বকর ও সুলাইমানকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কোম্পানির প্রশাসনিক ও পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ ও মামলা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে,চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির সুযোগে তার স্বাক্ষর জাল করে অথবা তার নাম ব্যবহার করে একটি মহল কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে আগামী ২৭ আগস্ট চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কোম্পানির সাধারণ সভা বা এজিএম আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি,দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত পরিচালকদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে আইনসম্মতভাবে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা প্রয়োজন।
তাদের দাবি, ২৭ আগস্টের সভার আগে আইডিআরএ কোম্পানির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার একই বিষয়ে পরপর ভিন্ন অবস্থান বা ব্যাখ্যা তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সিইও অপসারণ,বেতন-ভাতা, পরিচালনা পর্ষদ,চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের একাধিক পরিচালকের বিষয় এবং আসন্ন সাধারণ সভাসহ সব অভিযোগ একসঙ্গে পর্যালোচনা করে আইডিআরএর স্পষ্ট ও লিখিত অবস্থান প্রকাশের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা,আইডিআরএর চেয়ারম্যান বিষয়টি সরাসরি তদারকি করে চলমান বিরোধের আইনসম্মত ও স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।
All rights reserved © 2019
Leave a Reply