
অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
রাজধানীর নন্দীপাড়া মৌজার সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-এর ৪১ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৯৬০ সালের একটি ক্রয়দলিলের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করা রাম আনন্দ মন্ডল অভিযোগ করেছেন,১৯৭১ সালের একটি দলিলের ভিত্তিতে আলহাজ্ব গ্রুপের আব্দুল আলী গং একই জমির ওপর মালিকানা দাবি করছেন।
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি,১৯৬০ সালের ১৮ জুলাই ৯২৯২ নম্বর রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে তৎকালীন রেকর্ডীয় মালিক নীরদ বালা দাস ৪১ শতাংশ জমি শ্রী রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে রূপচাঁদ মন্ডল ১৯৬৭ সালে মারা গেলে তার ছেলে রাম আনন্দ মন্ডল ওয়ারিশসূত্রে ওই সম্পত্তির মালিকানা লাভ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ইস্টার্ন হাউজিংয়ের নামজারি নিয়ে বিরোধ
রাম আনন্দ মন্ডলের পক্ষ থেকে জানানো হয়,জমিটির নামজারি করতে গিয়ে তারা দেখতে পান যে সম্পত্তিটি ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামে নামজারি করা হয়েছে। পরে ২৪/২৫ মিস কেসের মাধ্যমে ওই নামজারি চ্যালেঞ্জ করা হয়।
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি,সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের নামজারি কর্তন করে রাম আনন্দ মন্ডলের নামে ১২৬৯১ (IX-I),২০২৫-২০২৬ নম্বর নামজারি গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ সম্পন্ন হয়।
বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিল। রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ, আলহাজ্ব গ্রুপের আব্দুল আলী গং ওই দলিলের ভিত্তিতে জমিটির মালিকানা দাবি করছেন।
এ নিয়ে রাম আনন্দ মন্ডল পক্ষের প্রশ্ন, ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে রূপচাঁদ মন্ডল ও গোপিচাঁদ মন্ডল জমিটি কিনে থাকলে তাদের ভাই লেবুচান মন্ডলের ওই সম্পত্তি বিক্রির আইনগত অধিকার কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল?
তাদের আরও দাবি, স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি ও তৎকালীন সময়ের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী লেবুচান মন্ডল ওই জমি বিক্রি করেননি কিংবা কারও সঙ্গে বায়নাপত্রও করেননি। তবে এ দাবির সত্যতা নির্ধারণে মূল দলিল, রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড, সাক্ষীদের বক্তব্য ও ভূমি সংক্রান্ত নথি যাচাই প্রয়োজন।
President’s Order No.12 of 1972 নিয়ে আইনগত প্রশ্ন।ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, ১৯৭১-৭২ সময়ে সম্পাদিত কিছু দলিলের আইনগত কার্যকারিতা পরবর্তী সময়ে President’s Order No. 12 of 1972-এর আলোকে প্রশ্নের মুখে পড়ে।তবে ৭৬৮১ নম্বর দলিলটি ওই আদেশের আওতাভুক্ত কি না এবং হলে এর সুনির্দিষ্ট আইনগত প্রভাব কী—তা সংশ্লিষ্ট নথি ও আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি আইনগত ব্যাখ্যা ও প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে নিষ্পত্তির দাবি উঠেছে।
মিস আপিল ও রিভিশন মামলা
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব), ঢাকার মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাম আনন্দ মন্ডল। তার দাবি, মামলার শুনানির তারিখ ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নির্ধারিত থাকার কথা থাকলেও এর আগে ১৭ আগস্ট ২০২৬ একটি আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন,তাকে যথাযথভাবে পক্ষভুক্ত না করেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য ভূমি অফিস ও ডেমরা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাম আনন্দ মন্ডল ভূমি আপিল বোর্ড,ঢাকায় রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে জানিয়েছেন।
রাম আনন্দ মন্ডলের অভিযোগ,আপিল ও রিভিশন প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় তার নামে সম্পন্ন নামজারি বাতিলের জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
জমিটির মালিকানা নিয়ে রাজেশ দাশ ও তপন কুমার দাস নিজেদের নীরদ বরন দাসের ছেলে হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পক্ষের প্রশ্ন, নীরদ বরন দাস যদি ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি রূপচাঁদ ও গোপিচাঁদ মন্ডলের কাছে বিক্রি করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা একই জমির ওপর কীভাবে মালিকানা দাবি করছেন?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে বিক্রয়দলিল,খতিয়ান,নামজারি, উত্তরাধিকার সনদসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাম আনন্দ মন্ডল আরও অভিযোগ করেছেন, আব্দুল আলী গংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রফিকুল ইসলাম, মুরাদ গংসহ কয়েকজন তার জমি দখল এবং নামজারি বাতিলের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল আলী গং ও সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্তও প্রয়োজন।
দলিল-রেকর্ড যাচাইয়েই মিলবে মালিকানার সমাধান
নন্দীপাড়া মৌজার সিএস দাগ নম্বর ৭৬৯-এর ৪১ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে ১৯৬০ সালের ৯২৯২ নম্বর দলিল, ১৯৭১ সালের ৭৬৮১ নম্বর দলিল, খতিয়ান, নামজারি রেকর্ড,২৪/২৫ মিস কেস,মিস আপিল নং ৪৩৮/২০২৪ এবং রিভিশন মামলা নং ৩-২১১/২০২৬সহ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,জমির মালিকানা নির্ধারণে নিবন্ধিত দলিল,সরকারি রেকর্ড,বৈধ উত্তরাধিকার, দখলের আইনগত ভিত্তি এবং আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের প্রভাব বা চাপ নয়,বরং প্রামাণ্য নথি ও আইনগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
বিষয়টি বিচারাধীন থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও আদালত ও উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আদেশের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পক্ষ।
All rights reserved © 2019
Leave a Reply