জেলার বিশেষ প্রতিনিধি :মোঃ হ্যাপি নারায়ণগঞ্জ।
দেশের অন্যতম শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে মাদক ব্যবসা,ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত এ জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান চললেও অপরাধী চক্রের তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের।
গত কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা,গাঁজা, নগদ অর্থ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সম্প্রতি ফতুল্লার দেওভোগ এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে প্রায় পাঁচ মণ গাঁজা,১০ থেকে ১২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, নগদ অর্থ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জনকে আটক করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মাদক কারবারিরা বিভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলেও গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযানের কারণে অনেক বড় চালান আটক হচ্ছে। তবে মাদকের মূল হোতাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন অভিযানে বাধা প্রদান, আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের শক্ত অবস্থান এবং তাদের নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত বহন করে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, বন্দর, কুতুবপুর, সানারপাড়, জালকুড়ি, চাষাঢ়া ও নিতাইগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চলতি বছরের মার্চ মাসে সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় কথিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় এক যুবকের গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই প্রতিরোধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ।
এদিকে মে মাসে বন্দর এলাকায় ছিনতাইয়ের একটি অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের একটি দল হামলার শিকার হয়। ওই ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন এবং একটি সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ। পরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নারায়ণগঞ্জ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ,কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন করা হয়। এ কারণে অপরাধী চক্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে শিল্প এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো।
অন্যদিকে সাধারণ পথচারী,শ্রমিক,শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের অভিযোগ,সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে নির্জন সড়ক ও অলিগলিতে ছিনতাইয়ের আশঙ্কা বেশি থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদক ও ছিনতাই দমনে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
তাদের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি এসেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে,শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক সরবরাহ চক্রের মূল হোতাদের শনাক্তকরণ,অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ,নিয়মিত টহল বৃদ্ধি, যুবসমাজকে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প,ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জকে নিরাপদ রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে মাদক ও ছিনতাইয়ের বিস্তার জেলার সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।