প্রতিবেদক- মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে চাঞ্চল্যকর শিশু অপহরণ ও মানব পাচারের ঘটনায় বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহৃত দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার এবং মানব পাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা। এ ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছেন এক আসামি।
মঙ্গলবার (১৯ মে) পিবিআই সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
পিবিআই জানায়, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মামলা নং-৩১,তারিখ ১৩ মে ২০২৬, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২-এর ৬/৭/৮/১০ ধারায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে।
পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো.মোস্তফা কামাল রাশেদ বিপিএম-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো.ফরহাদ বিন করিম এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ আভিযানিক দল তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে গত ১৮ মে গভীর রাতে রাজধানীর বনানী কড়াইল বস্তি এলাকার টিএনটি গেট এলাকা থেকে মামলার মূলহোতা এমদাদুল হক রাব্বানী (২৩) কে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে নুর-ই-নাসরিন (২৯) কে আটক করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে অপহৃত ২৮ দিন বয়সী শিশু আব্দুর রহমান জুবায়েতকে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে গত ১৩ মে রাতে সাভারের আড়াপাড়া এলাকার নিঝুমনিবাস এলাকা থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আরিয়ানকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিশু দুটির পিতা মেজবাহ উদ্দিনকেও গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাত বছর আগে ঝর্না আক্তারের সঙ্গে মেজবাহ উদ্দিনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে আরিয়ান (৫) ও আব্দুর রহমান জুবায়েত (২৮ দিন) নামে দুই সন্তান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই মেজবাহ উদ্দিন একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করেন। একইসঙ্গে স্ত্রীর কাছে টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ এবং টাকা না দিলে সন্তানদের বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দিতেন।
অভিযোগ অনুযায়ী,গত ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় মেজবাহ উদ্দিন তার পূর্বপরিচিত এমদাদুল হক রাব্বানীর সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে দুই সন্তানকে বাসা থেকে অপহরণ করেন। পরে ভুক্তভোগী মা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারেন,শিশু দুটিকে পাচারের উদ্দেশ্যে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরপর তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে,গ্রেফতারকৃত এমদাদুল হক রাব্বানী একটি সক্রিয় মানব পাচার চক্রের সদস্য। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারকে টার্গেট করে শিশু সংগ্রহ এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে একাধিক শিশুপাচারের তথ্য-প্রমাণও মিলেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
তদন্তে আরও জানা যায়, মেজবাহ উদ্দিন মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া একাধিক বিয়ে করে নিজের সন্তানদের অর্থের বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে আদালত এমদাদুল হক রাব্বানীর পাঁচ দিনের এবং নুর-ই-নাসরিনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে মেজবাহ উদ্দিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।
পিবিআই জানিয়েছে,এই মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি আরও কোনো শিশু পাচারের শিকার হয়েছে কিনা, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।